নৈহাটির বাসিন্দা বিদ্যাধর ভট্টাচার্য: ভারতের পরিকল্পিত শহরের স্থপতি

পরিচয় ও জন্ম

বিদ্যাধর ভট্টাচার্য (১৬৯৩−১৭৫১) ছিলেন ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর, অর্থাৎ রাজস্থানের জয়পুরের প্রধান স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, বাস্তুশাস্ত্রী ও গণিতজ্ঞ।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নৈহাটি শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল সন্তোষরাম ভট্টাচার্য।

শিক্ষালাভ ও দক্ষতা

তিনি ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান ছিলেন। গণিত, জ্যোতিষ, বাস্তুশাস্ত্র, কারুশিল্প, পূর্তবিদ্যা এবং রাজনীতি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন।

এ কারণে অম্বর (আমের) শহরের রাজদরবারে তিনি জুনিয়র অডিটর হিসেবেও কাজ করেছিলেন।

রাজস্থান যাত্রা ও জয়পুর শহরের নকশা

১৬৯৩ সালে নৈহাটিতে জন্ম নেওয়া এই বঙ্গসন্তান রাজস্থানের মহারাজা সওয়াই জয় সিং দ্বিতীয়ের দরবারে স্থান পেয়েছিলেন।

১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা তাঁর কাছে কথিতভাবে অনুরোধ করেন নতুন রাজধানী গড়ার জন্য— যা আজকের জয়পুর।

বিদ্যাধর শহরের নকশা বানানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। তিনি ইউক্লিড, টলেমি—প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বই, সঙ্গে ভারতের প্রাচীন শিল্পতত্ত্ব, বাস্তু, জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইও ব্যবহার করেছেন।

রাজাকে তিনি দেখিয়েছিলেন আধুনিক পরিকল্পিত শহরের সূক্ষ্মতা — নটা বর্গাকার ব্লক, যার সাতটি সাধারণ মানুষের, দুটি প্রশাসনিক কাজে। সৌরমণ্ডলের গ্রহ ও সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাগ করেছেন শহরকে।

স্থাপত্য ও নতুনত্ব

  • মূল বৈশিষ্ট্য: শহরের প্রত্যেকটি রাস্তা ছিল একে অপরের সঙ্গে সংযোগযুক্ত।
  • পরিকল্পনা: শহরকে ঘিরে কুড়ি ফুট উঁচু পাঁচিল, সাতটি বৃহৎ প্রবেশদ্বার।
  • বাস্তু, বিজ্ঞান ও কারুকার্য: রাজপুত, মোগল, ব্রিটিশ—তিন ধরনের স্থাপত্যের সংমিশ্রণ।
  • সুরক্ষা: আরাবল্লি পাহাড় প্রাকৃতিক দুর্গ, সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত।
  • ব্যবস্থাপনা: জমি বণ্টন, স্থান নির্ধারণের জন্য তাঁর অনুমোদন ছিল আবশ্যিক।

সম্মান ও উত্তরাধিকার

জয়পুর শহরকে তৈরি করতে বিদ্যাধর ভট্টাচার্য চার বছরেরও বেশি সময় নিয়েছিলেন।

তাঁর পরিকল্পনা আজও পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ও কার্যকরী শহর হিসেবে পরিচিত।

UNESCO-ও জয়পুরকে ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বিস্মৃতি ও সুপ্ত গৌরব

আধুনিক প্রযুক্তিশিল্পের অনেক আগে, মাত্র দেশীয় জ্ঞান ও উপকরণেই বিদ্যাধর ভট্টাচার্য এই যুগান্তকারী কীর্তি রেখেছিলেন।

আজও তাঁর নাম যথেষ্ট আলোচিত না হলেও, জয়পুর শহরের পরিকল্পনা ও সৌন্দর্য দেখলেই তাঁর গৌরব উদ্ভাসিত হয়। অদৃশ্য অক্ষরে এই বঙ্গসন্তানের নাম চিরস্থায়ী।

সারাংশ

বিদ্যাধর ভট্টাচার্য নৈহাটির এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া বাংলা ও ভারতের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম কৃতজ্ঞতাভাজন।

তাঁর পরিকল্পনায় গড়ে ওঠে আধুনিক ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর—আজকের পিঙ্ক সিটি জয়পুর। স্থপতি, গণিতজ্ঞ, বাস্তুশাস্ত্রী ও প্রশাসক—সবটাই তিনি ছিলেন একসাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *