ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল–এর চূড়ায় কালো ব্রোঞ্জের তৈরি “ভিক্টোরিয়ার পরী” (Victory Angel) বা “এঞ্জেল অফ ভিক্টরি” দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার চিরকালীন ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে।
পরীর মূর্তিটি নির্মিত হয়েছিল ১৯২০-১৯২১ সালের মাঝামাঝি, ইংল্যান্ডের চেলটেনহ্যাম শহরে তৈরি করে কলকাতার ময়দানে নিয়ে আসা হয়। নির্মানের নকশা করেন শিল্পী জর্জ ম্যানসিনি ও স্থপতি রবার্ট লিন্ডসে ক্লার্ক।
তৎকালীন লর্ড কার্জন এবং মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানির উদ্যোগে কলকাতার ঐতিহ্যশালী এই সৌধটির মাথায় এই পরী বসানো হয়।
স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য
পরীর আকৃতি: ১৬ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের মূর্তি (৩.৫ টন ওজন। রয়েছে বল-বিয়ারিং-এর উপর বসানো, বাতাসের গতিতে ঘুরতে পারে)।
বাঁ হাতে রয়েছে এক বিশেষ ‘বাঁশি’ অর্থাৎ শিং, ডান হাতে ফুলের গুচ্ছ–এর পিছনে বিশাল পাখা, যেন বিজয় ও উন্নয়নের প্রতীক।
এই মূর্তি বাতাসের স্রোতের সঙ্গে ঘুরত। প্রথমে ১৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা বেগের বাতাসে ঘুরত, পরে শহরের উঁচু বাড়ির জন্য বাতাস কমে গেলে ঘূর্ণন বন্ধ হয়। আমফানের মতো ঝড়ে আবার এক-একবার তা ঘুরতে দেখা যায়।
রহস্য ও লোককথা
“পরী”কে ঘিরে বহু গল্প, আখ্যান ও কিংবদন্তি রয়েছে। কেউ বলেন, এই পরী ব্রিটিশ শাসকের ‘চর’, কেউ বলেন রাণী ভিক্টোরিয়ার বিজয়দূত।
সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য বলেছেন, কলকাতার ক্লান্ত দণ্ডবায়সেরা সন্ধ্যায় পরীর মাথায় এসে বসে, সে প্রেম ও কান্না–সব কিছুর নিভৃত, অভিমানী সাক্ষী।
সংস্কৃতি ও পর্যটন
মেমোরিয়ালের মাথায় চূড়ার পাশে কালো পরী–কলকাতার ছবি ও ভ্রমণকার্যে বারবার উঠে আসে।
শহরের প্রেমিক-প্রেমিকার, পর্যটকের আবেগের কেন্দ্রে “পরীর” বিশেষ আকর্ষণ।
শিল্প-স্থাপত্যের বিশেষত্ব
ভারতীয়, ইউরোপীয়, ইসলামিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণে নির্মিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তার শ্বেত পাথরের চূড়ায় কালো পরী চিহ্নিত করে পল্লবিত বাংলার শিল্প ও ঐতিহ্য।
সৌধের গম্বুজে ব্রোঞ্জের গ্লোব–তাতে পারদ ভরা, তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা পরী আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত।
সারাংশ
ভিক্টোরিয়ার এই কালো পরী কলকাতার ইতিহাস, শিল্প, প্রেম ও সংস্কৃতির এক বিমূর্ত প্রতীক।
শিল্পীজীবনের ব্যতিক্রম, স্থাপত্যের জয়ধ্বনি এবং কিংবদন্তির রহস্যে ঘেরা এই ব্রোঞ্জের মূর্তি শতাব্দী পার করে আজও শহরের মাথার উপরে দাঁড়িয়ে আছে, ভারত-ইউরোপের সাংস্কৃতিক সমুদ্রসেতুতে শ্রদ্ধা, বিজয় ও আধুনিকতার বার্তা বহন করে।