Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

ইলা ঘোষ মজুমদার (বিবাহের পূর্বে ইলা মজুমদার) (২৪ শে জুলাই ১৯৩০ – ১১ ই ডিসেম্বর ২০১৯) বাংলার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার এবং ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।
তিনি শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রথম ছাত্রী এবং সেই কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণকারী প্রথম মহিলা।
তার জীবন ও কর্মকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং বাংলার নারী শিক্ষা ও প্রকৌশল শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
ইলা মজুমদার ১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার পেয়ারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতা যতীন্দ্র কুমার মজুমদার ছিলেন বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা ছিলেন গৃহিণী।
তার পরিবার অত্যন্ত প্রগতিশীল ছিল। পিতা যতীন্দ্র কুমার মজুমদার প্রথম শ্রেণীতে এমএসসি পাশ করেছিলেন এবং তিনি মেয়েদের শিক্ষা ও উন্নয়নে বিশ্বাস রাখতেন।
এই পারিবারিক পরিবেশের কারণে ইলা মজুমদার ছোটবেলা থেকেই মুক্ত পরিবেশে বড় হয়েছিলেন।
১২ বছর বয়সে তিনি সাইকেল চালাতে শিখেছিলেন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে জিপ চালানো শিখেছিলেন – যা সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত অসাধারণ ছিল।
সরকারি কর্মচারী হওয়ার কারণে পিতার ঘন ঘন বদলির কারণে ইলার বিদ্যালয়ের পাঠ বিভিন্ন স্থানে হয়েছিল। খুলনার একটি স্কুলে তিনি নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে ধর্মীয় উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তার পরিবার কলকাতায় চলে আসে।
কলকাতায় এসে তিনি পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটার কারণে এক বছর হারান। ১৯৪৬ সালে তিনি প্রাইভেট থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন কিন্তু পরীক্ষার ফল আশানুরূপ হয়নি। তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট (আইএসসি) পাশ করেন।
ছোটবেলা থেকেই তার কারিগরি বিদ্যায় আকর্ষণ ছিল। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী নিকুঞ্জ বিহারী মাইতির উদ্যোগে মহিলাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং-সহ শিক্ষার সব ক্ষেত্রের পড়ার দরজা খুলে দেওয়া হয়।
ইলা মজুমদার ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাক্তারি দুটি প্রবেশিকা পরীক্ষাতেই ভালো ফল করেছিলেন কিন্তু তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন।
১৯৪৭ সালে শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রথমবারের মতো মহিলাদের জন্য দরজা খুলে দিলে দুজন ছাত্রী প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
ইলা মজুমদার ও অজন্তা গুহ দুজনেই ভর্তি হন। কিন্তু অজন্তা গুহ একবছর পরেই বাদ পড়ে যান। তখন কলেজে ভারতীয় এবং ইউরোপীয়ান মিলিয়ে আট শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ভারতবর্ষের প্রথম মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একমাত্র ছাত্রী হয়ে ওঠেন ইলা মজুমদার।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম দরকার বলে তাকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে নিষেধ করেন। সেই কারণে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন।
ছাত্রীদের জন্য আলাদা হোস্টেল না থাকায় তিনি কলেজ লাইব্রেরির বাঁ দিকের একটি ঘরে থাকতেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পুলিন বিহারী ঘোষ প্রথম ছাত্রী ইলাকে শুরু থেকেই স্নেহ করতেন এবং কলেজে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন ইলার অভিভাবক।
প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলেও ধীরে ধীরে ছাত্রদের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “গোটা ব্যাচে আরও একজন মেয়ে ছিল।
ছেলেরা প্রথমে অবাক হয়েছিল, কিন্তু শীঘ্রই আমরা ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম। তারা আমাদের সাথে গল্প করত, ঠাট্টা করত এবং ক্রিকেট ম্যাচে তাদের উৎসাহ দিত। আমরা কখনো অস্বস্তি বোধ করিনি।”
কলেজের সব ধরনের খেলাধুলায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন ইলা। নিজে খুব ভালো তাসের খেলা ব্রিজ খেলতেন। কলেজের একমাত্র ছাত্রী হিসেবে সকলের প্রিয়প্রাত্রী ছিলেন এবং পঠনকালে সহপাঠীদের খুবই সহযোগিতা পেয়েছিলেন।
১৯৫১ সালে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বাংলা তথা সমগ্র ভারতের প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।
তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলার নারী শিক্ষা ও প্রকৌশল শিক্ষার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
স্নাতক হওয়ার পর শিক্ষানবিশি ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনার জন্য তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো যান। সেখানকার বিখ্যাত ‘বার অ্যান্ড স্ট্রাউড’ (Barr and Stroud) সংস্থা থেকে স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেন।
কলেজের অধ্যক্ষ ভারতে তার শিক্ষানবিশি করাতে রাজি হননি কারণ তিনি মনে করতেন যে একজন মহিলার জন্য ভারতীয় কারখানায় কাজ করা অস্বস্তিকর হবে।
তিনি বিদেশে শিক্ষানবিশি করতে যাওয়া প্রথম ভারতীয় মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আরেকটি রেকর্ড স্থাপন করেন।

ভারতে ফিরে ইলা মজুমদার দেরাদুনের ‘অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’ (Ordnance Factory Dehradun) -এর ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন।
এখানে তিনি আরেকটি মাইলফলক স্থাপন করেন – তিনি ভারতের প্রথম মহিলা যিনি ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কাজ করেছিলেন। তিনি স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন এবং ছয় মাস চাকরি করেছিলেন।
১৯৫৫ সালে তিনি দিল্লি পলিটেকনিক কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এখানে কর্মরত অবস্থায় তিনি অত্যন্ত অল্প সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর উপর দুটি বই প্রকাশ করেন:
এই দুটি বই তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী ছিল।
১৯৫৯ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এরপর তিনি ‘মজুমদার’ পদবীর বদলে ‘ঘোষ’ পদবী গ্রহণ করেন। বিয়ের পরপরই তিনি স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে আসেন এবং ইনস্টিটিউট অফ জুট টেকনোলজি-তে লেকচারার পদে যোগ দেন।
১৯৬৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর তার উদ্যোগে কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে বাংলার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (Women’s Polytechnic College, Kolkata) প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
প্রথমদিকে মেয়েদের উপযুক্ত মনে করে আর্কিটেকচার এবং ইলেকট্রনিক্স নিয়েই পঠন-পাঠন শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সফল হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পায়।
১৯৬৭ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত নারী প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (Second International Conference of Women Engineers and Scientists) যোগদান করেন। এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নারী প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের সাথে তার মতবিনিময় হয়।
১৯৮৫ সালে তার কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে ইউনেস্কো তাদের প্রকল্পে বাংলাদেশের ঢাকায় একটি মহিলা পলিটেকনিক কলেজ খোলার দায়িত্ব তাকে দেয়।
প্রথম দিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে অধ্যক্ষ পদ থেকে অব্যাহতি দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু মাতৃভূমির প্রতি টান এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণের প্রবণতা তাকে বাংলাদেশে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।
তিনি সাফল্যের সাথে ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
আর্কিটেকচার এবং ইলেকট্রিক্যাল – দুটি বিভাগ, ১২ জন শিক্ষক এবং প্রায় ৭০ জন ছাত্রী নিয়ে ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু করেন তিনি।
বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য এটি ছিল তখন সর্বোচ্চ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
ঢাকায় অবস্থানকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বহু হিন্দু পরিবারকে সাহায্য করেছিলেন।
কোকিলা সাহা নামক এক বিধবা সর্বহারা মহিলাকে সঙ্গী করে কলকাতায় নিয়ে এসে নিজের আত্মীয়ের মতো আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং আজীবন নিজের সঙ্গী করেই রেখেছিলেন।
ইলা ঘোষ মজুমদার তার কর্মজীবনে যে লিঙ্গবৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “আমি অবশ্যই আমার পেশাগত জীবনে সব সময় লিঙ্গবৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছি। আমার মনে হয়েছে সমাজের মানসিকতা বদলাতে অনেক সময় লাগবে এবং তা সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।”
সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারীর ইঞ্জিনিয়ার হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে তিনি সর্বদা এমন কাজ করতে পছন্দ করতেন যা সমাজ মনে করত মেয়েরা পারবে না। তার এই দৃঢ়তা ও সাহসই তাকে বাংলার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হতে সাহায্য করেছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে ইলা মজুমদারের দুই ছেলে ছিল। তার একটি মেয়েও ছিল কিন্তু সেই মেয়ের অকাল মৃত্যু হয়।
তিনি কলকাতার লেক প্লেসে থাকতেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি ব্রিজ খেলার খুব শৌখিন ছিলেন এবং টেলিভিশন দেখতে খুব পছন্দ করতেন।
ইলা ঘোষ মজুমদার ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলা তথা ভারতের প্রকৌশল শিক্ষা ও নারী শিক্ষার জগৎ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হারায়।
ইলা ঘোষ মজুমদারের অবদানগুলি:

তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলি আজও বাংলা ও বাংলাদেশের মহিলা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে মেয়েরা প্রকৌশল শিক্ষায় শুধু পারদর্শী নয়, বরং নেতৃত্বও দিতে পারে।
তার জীবন ও কর্মকাণ্ড পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের কাছে এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সামাজিক বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
ইলা ঘোষ মজুমদার শুধু একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক।
তার জীবনকাহিনি আজও হাজারো মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে একজন নারী সমাজের যেকোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।
আজকের দিনে বাংলা ও ভারতের প্রকৌশল শিক্ষায় নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখে আমরা বুঝতে পারি যে ইলা ঘোষ মজুমদারের স্বপ্ন ও সংগ্রাম কতটা সার্থক হয়েছে।
তিনি যে পথ দেখিয়েছিলেন, আজ সে পথ ধরে হাজার হাজার মেয়ে এগিয়ে চলেছে।
ইলা ঘোষ মজুমদার কেবল একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব যিনি বাংলার নারী শিক্ষার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।
তার জীবন ও কর্মকাণ্ড আজও আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক মহান দৃষ্টান্ত।